মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০১:০৪ পূর্বাহ্ন
বিশেষ ঘোষণাঃ
• করোনাভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, টিকা নিন। • গুজব নয়, সঠিক সংবাদ জানুন। • দেশের কিছু জেলা, উপজেলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং বিশ্বের কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে (খালি থাকা সাপেক্ষে) প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। • আপনি কি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ফিল্ম ও মিডিয়া, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা' বিষয়ে পড়ছেন? বাংলাদেশ প্রতিবেদন আপনাকে দিচ্ছে 'ইন্টার্নশিপ'-এর সুযোগ। • আপনিও হতে পারেন সাংবাদিক! চলতি পথে নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি, কারো সফলতা বা যেকোনো ভিন্নধর্মী খবর (ছবি অথবা ভিডিও) পাঠাতে পারেন। • হটলাইনঃ +৮৮০ ১৯ ০৯ ৮৬ ২৬ ১৬ (হোয়াটসঅ্যাপ), • ই-মেইলঃ protibedonbd@gmail.com • গুগল, ফেসবুক ও ইউটিউবে আমাদের পেতে Bangladesh Protibedon লিখে সার্চ দিন।

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত ও বাংলাদেশে রোকেয়া স্বীকৃতি : ড. আ.ন.ম এহছানুল মালিকী

বাংলাদেশ প্রতিবেদন
প্রকাশকালঃ রবিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত ও বাংলাদেশে রোকেয়া স্বীকৃতি : ড. আ.ন.ম এহছানুল মালিকী

১৮১৭ সালে হিন্দুরা যখন ব্রিটিশদের কাছ থেকে কলকাতা আদায় করে নেয় তখন সেখানকার মুসলমানরা ইংরেজদের শিক্ষাকে সম্পূর্ণ ভাবে এড়িয়ে চলতো। যার ফলশ্রুতিতে ১০৯ বছর মুসলমানরা শিক্ষা থেকে পিছিয়েছিল। সে সময়ে নারী শিক্ষার গুরুত্ব এবং শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা মুসলমানদের মাঝে উপলব্ধি করতে ১৯২৬ সালে বাঙালি মহিয়সী নারী লেখক, সমাজিক কর্মী এবং শিক্ষাবিদ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত কলকাতা মুসলিম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শতবছরের মূখ্যতার অবসান ঘটান।
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার অন্তর্গত পায়রাবন্দ গ্রামে ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮০ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জহীরউদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের যিনি একজন জমিদার ছিলেন। তাঁর মাতার নাম রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। রোকোয়ারা দুই বোন ও দুই ভাই ছিলেন।
বেগম রোকেয়ার পিতা আরবি, উর্দু, ফারসি, বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় পরাদর্শী হলেও মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন রক্ষণশীল। রোকেয়ার বড় দু’ভাই মোহাম্মদ ইব্রাহীম আবুল আসাদ সাবের, খলিলুর রহমান আবু যায়গাম সাবের ও বড় বোন করিমুন্নেসার থেকে ছোট বোন রোকেয়া ছিল তাদের থেকে আরো বেশী সাহিত্যনুরাগী। বেগম রোকেয়ার শিক্ষা লাভ, সাহিত্য চর্চা গঠনে বড় দু’ভাই ও বোনের যথেষ্ট অবদান ছিল। পাঁচ বছর বয়সে মায়ের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস করার সময় একজন শিক্ষীকা শিক্ষয়িত্রীর নিকট তিনি কিছুদিন লেখাপড়ার সুযোগ পেলেও সমাজ ও আত্মীয় স্বজনদের ভ্রুকুটির কারণে তা বন্ধ করে দিতে তিনি বাধ্য হন। তবু রোকেয়া দমে যাননি। বড় ভাই-বোনদের সমর্থন ও সহায়তায় তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি এবং আরবি আয়ত্ত করেন। বিহারের ভাগলপুর নিবাসী উর্দু ভাষী সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে ১৮৯৮ সালে রোকেয়ার বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। উদার ও ম্ক্তু মনের অধিকারী স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় রোকেয়া দেশি-বিদেশি লেখকদের রচনার সঙ্গে নিবিড় ভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পান এবং ক্রমশ ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর সাহিত্যচর্চার সূত্রপাতও ঘটে স্বামীর অনুপ্রেরণায়। তবে রোকেয়ার বিবাহিত জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯০৯ সালের ৩ মে সাখাওয়াৎ হোসেন মারা যান। তাদের কোন সন্তা-সন্তানাদি ছিল না।
১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর স্বামীর প্রদত্ত অর্থে পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে রোকেয়া ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল স্থাপন করেন। রোকেয়া পরবর্তীতে পারিবারিক কারণে ভাগলপুর ছেড়ে কলকাতায় এসে ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতার ১৩ নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের একটি বাড়ীতে মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে নতুন করে ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুল পরিচালনা ও সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রোকেয়া নিজেকে সাংগঠনিক ও সামাজিক কর্মকা-ে ব্যস্ত রাখেন। বেগম রোকেয়া ১৯১৬ সালে তিনি মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তিনি ১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বাংলার নারী শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।
১৯০২ সালে ‘পিপাসা’ নামে একটি বাংলা গল্প লিখে সাহিত্য জগতে তার অবদান রাখা শুরু হয়। পরবর্তীতে মতিচূর প্রবন্ধ সংগ্রহের প্রথম খ-টি ১৯০৪ সালে ও দ্বিতীয় খ-টি ১৯২২ সালে রচনা করে রোকেয়া তাঁর নারীবাদী চিন্তার প্রকাশ ঘটান। সুলতানার স্বপ্ন ১৯০৫ সালে, পদ্মরাগ ১৯২৪ সালে, অবরোধ বাসিনী ১৯৩১ সালে ইত্যাদি তাঁর সৃজনশীল রচনা। তাঁর ‘সুলতানার স্বপ্ন’কে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যে একটি মাইলফলক ধরা হয়। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবার আগে তাঁর লেখাগুলো নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও নবপ্রভা, মহিলা, ভারত মহিলা, আল-এসলাম, নওরোজ, মাহে নও, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, ঞযব গঁংংধষসধহ, ওহফরধহ খধফরবং গধমধুরহব প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন।
রোকেয়া যে দেশের মানুষ, আজ সেই দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। হিন্দু, মুসলমান সবাই বাংলা ভাষায় কথা বলে। শিক্ষিত মুসলমান সমাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার জনপ্রিয় করতে না পারলে বাংলাদেশে বাংলা বর্ণমালা আজ এই মর্যাদার আসনে থাকতো না। হামাগুড়ি দিয়ে কিছুদূর আসলেও আবার খোড়া হয়ে যেতো। পাকিস্তান আমলে যখন আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব দেয়া হয়, তখন এর বিরোধিতাকারীদের মাঝে শিক্ষিত মুসলমানের সংখ্যা ছিলো উল্লেখ করার মত। বাংলা ভাষাপ্রেমী এই উচ্চবিত্ত মুসলমান শ্রেণী তৈরিতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। যারা ভাষার শরীর থেকে ধর্মীয় বিদ্বেষ সরিয়ে বাঙালির ঘরে বাংলা ভাষা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন রোকেয়া তাদের একজন। নারী শিক্ষা, সাখাওয়াত মেমোরিয়াল, লেখালেখি আর ধর্মীয় অবরুদ্ধতা থেকে মুক্তির জন্য রোকেয়া সাখাওয়াত লড়াই করে জীবন কাটিয়ে যান। পেশা হিসেবে নয়, এই সংগ্রামকে তিনি দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন। তার এই দায়িত্ব থেকে তিনি একদিনের জন্যও কখনো ছুটি নেননি। এমনকি জীবনের শেষমুহূর্তেও কিছু না কিছু লিখেছেন। মৃত্যুর রত্রিতে ‘নারীর অধিকার’ নামে একটি অসমাপ্ত প্রবন্ধ লিখেন, যা পরদিন লেখার টেবিলে পেপারওয়েটে চাপা রাখা অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে মাহে-নও পত্রিকায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। এমন গুনি একজন মহিয়ষী নারী ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বরের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। পরে তাকে উত্তর কলকাতার সোদপুরে কবরস্থানে দাফন সম্পাদন করা হয়।
বাঙালী রোকেয়া সাখাওয়াত ছিলেন নারী জাগরনের অগ্রদ্যুত ও উন্ন্য়নের পথ দিশারী। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এই নারীত্ববাদীকে চির স্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখতে এবং তার নামকে সম্মানে ভূষিত করার পেছনে বাংলাদেশ অন্যান্য বিশ্বের কাজে একটি রোল মডেল। যেমনটা দেখা মেলে-
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়: ৮ অক্টোবর ২০০৮ সালে রংপুর বিভাগে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোন নারী নামে বাংলাদেশে প্রথম কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণ করেণ।
বেগম রোকেয়া হল: ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রীদের আবাসন ‘চামেলি হোস্টেল’ কে পরবর্তীতে মহিয়সী বাঙালী নারী বেগম রোকেয়ার অবদানের চিরস্মরণীয় করে রাখতে ১৯৬৪ সালে রোকেয়া হল নামকরণ করা হয়।
সার্চ ইঞ্জিন বেগম রোকেয়ার গুগল ডুডল: ৯ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে গুগল হোমপেজে বেগম রোকেয়ার ১৩৭ তম জন্মদিনটি উদযাপন করা হয়।
বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র: বাংলাদেশ সরকারের শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অধীনে রোকেয়া সাখাওয়াতের পৈতিক ভিটার ৩ দশমিক ১৫ একক ভূমির উপর নির্মিত হয়েছে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র। এই স্মৃতি কেন্দ্রে অফিসভবন, সর্বাধুনিক গেস্ট হাউজ, চারতলা ডরমেটরি ভবন, গবেষণা কেন্দ্র, গবেষণা কক্ষ, গ্রন্থাগার ইত্যাদি রয়েছে।
বেগম রোকেয়া পদক: ১৯৯১ সাল থেকে নারী কল্যানসংস্থা বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকীতে রোকেয়া পদক প্রদান শুরু করেন। পরবর্তীতে সরকারী ভাবে ১৯৯৬ সালের ৯ ডিসেম্বর মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয় কর্তৃক আয়োজিত বেগম রোকেয়া দিবস অনুষ্ঠানে এককালীন এক লক্ষ টাকা, একটি সম্মানপত্র ও ১৮ ক্যারেট ২৫ গ্রাম ওজনেরএকটি স্বর্ণ পদক প্রদান করা হয়।
বেগম রোকেয়ার সাহিত্যকর্মের প্রকাশভঙ্গী রচনারীতি বৈশিষ্ট্য ও মৌলিকত্ব ছিল উজ্জ্বল। তাঁর ভাষা সহজ, সরল শানিত ও বুদ্ধিদীপ্ত। তাঁর সাহিত্য নারী মুক্তি, নারী শিক্ষা, অর্থনেতিক স্বনির্ভরতা এবং সামাজি কুপমন্ডুকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের মর্মবাণী রূপ লাভ করেছে। নারীর স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি এই চিন্তাই লেখিকার চিত্তকে রেখেছিলো সদ্য জাগ্রত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ