শনিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২১, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন
জরুরী ঘোষণাঃ
দেশের কয়েকটি জেলা, উপজেলা, থানা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে (খালি থাকা সাপেক্ষে) প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। যোগাযোগঃ ০১৯ ০৯ ৮৬ ২৬ ১৬ হটলাইন। বিশ্বের কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। যোগাযোগঃ +৮৮ ০১৯ ০৯ ৮৬ ২৬ ১৬ হোয়াটসআপ। আপনিও হতে পারেন সাংবাদিক! চলতি পথে নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি, কারো সফলতা বা যে কোনো ব্যতিক্রম খবর পাঠিয়ে দিতে পারেন। ছবি ও ভিডিও থাকলে আরো ভাল। পাঠিয়ে দিন আমাদের এই ঠিকানায়: protibedonbd@gmail.com • আপনি কি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় পড়শুনা করছেন? বাংলাদেশ প্রতিবেদন আপনাকে দিচ্ছে ‘ইন্টার্নশিপ’ এর সুযোগ। আজই যোগাযোগ করুন। করোনা থেকে বাঁচতে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।

ভার্মন্ট: রঙের ভিন্ন জীবন দর্শন -লিটু আনাম

লিটু আনাম, নিউইয়র্ক প্রতিনিধি / ১১৬ /২০২১
প্রকাশকালঃ বৃহস্পতিবার, ৪ নভেম্বর, ২০২১

ভার্মন্ট: রঙের ভিন্ন জীবন দর্শন -লিটু আনাম

সাউন্ড অব মিউজিক সিনেমাটি যাঁরা দেখেছেন তাঁদের হয়তো মনে থাকবে, অস্ট্রিয়ার ভন ট্রাপ এবং তাঁর পরিবার নাৎসিদের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য ১৯৩৮ সালে দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। সেই পরিবারের প্রায় সকলেই ছিল গানবাজনার শিল্পী এবং অস্ট্রিয়া থেকে পালানোর পর তারা বিভিন্ন দেশে গানের অনুষ্ঠান করে বেড়িয়েছিল তিন বছর। ১৯৪১ সালে তারা গিয়েছিল ভারমন্টের স্টোওতে।

জায়গাটির প্রাকৃতিক অবস্থান এবং সৌন্দর্য দেখে তাদের মনে পড়ে গিয়েছিল ফেলে আসা দেশের কথা এবং তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেখানে বসতি স্থাপনের। তারা অনেক কষ্টে বানিয়েছিল একটি বাড়ি, যা পরে পরিচিত হয়েছিল ভন ট্রাপ লজ নামে। তারপর অনেক দশক পেরিয়ে গিয়েছে। প্রথমদিকে ট্রাপ পরিবারের বংশধররা সেই লজে অতিথিদের থাকতে দিত। পরে সেই লজের পাশে গড়ে উঠেছে একটি বড় আকৃতির হোটেল। সাউন্ড অব মিউজিক সিনেমাটি দেখার পর থেকে আমার খুব শখ ছিল একদিন স্টোওতে যাবো ট্র্যাপ ফ্যামিলি লজ দেখতে।

আমেরিকায় চারটি ঋতু। প্রতি ঋতুতেই প্রকৃতি তার নিজস্ব রূপ ধারন করে। একটি ঋতু থেকে অন্য ঋতু সম্পূর্ন আলাদা এবং নিজস্ব স্বকীয়তায় বিরাজমান। আমেরিকায় শরৎকাল যেন একটু ভিন্নভাবে ডামাডোল পিটিয়েই হাজির হয়। প্রকৃতি হয়ে ওঠে বর্নিল। গাছের সকল পাতা ফুলে পরিনত হয়। আমেরিকায় শরৎকালকে বলে ফল (পাতা ঝরার সময় বলে এই নাম); আর সে-সময় সকল গাছের পাতা ঝরে পড়ার আগে নিজের সবুজ রং ছেড়ে নানা রঙে সাজে। শরৎকালে পাতাদের এই রং বদলকেই বলে ফল ফলিয়েজ। নিউ ইয়র্কের আশপাশে ফল ফলিয়েজ দেখা হয প্রতি বছরই। কিন্তু ফল ফলিয়েজ দেখার আসল স্থান যে ভার্মন্ট সেটা সকলের জানা। তাই এবারের পরিকল্পনা বার্নি স্যান্ডার্সের ভার্মন্ট। ভার্মন্ট নামটি ভার্ড মন্ট মানে সবুজ পাহাড় থেকে আসছে। চারপাশে সুউচ্চ পাহাড় পর্বতে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বরপুত্র এই ভার্মন্ট। ২০ জুলাই, ১৭৬৪ সালে রাজা তৃতীয় জর্জ সীমানা নির্ধারনের মাধ্যমে নিউ হ্যাম্পশায়ার এবং নিউ ইয়র্ক পশ্চিম তীর বরাবর কানেক্টিকাট নদী, উত্তরে ম্যাসাচুসেটস, এবং দক্ষিণে ৪৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ।

এই ডিক্রি অনুসারে, নিউ ইয়র্ক এর আলবানি কাউন্টির অংশই বর্তমানে ভার্মন্ট হিসাবে পরিচিত। নিউইয়র্ক যখন নিউ হ্যাম্পশায়ার অনুদানের জমির স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় তখন নিউ হ্যাম্পশায়ার (বর্তমান ভার্মন্টে), অসন্তুষ্ট উপনিবেশবাদীরা বিরোধী দলে সংগঠিত হয়েছিল, যার ফলে ১৫ জানুয়ারী, ১৭৭৭ সালে স্বাধীন ভার্মন্টের সৃষ্টি হয়েছিল।

৭ জনের একটি বড় গ্রুপ নিয়ে নিউ হ্যাম্পশায়ারের ফ্রাঙ্কোনিয়াতে উঠেছি গত পরশু। গতকাল পুরো নিউ হ্যাম্পশায়ার ঘুরে বেড়িয়েছি। আজ দিনটি শুধুই ভার্মন্টের। যদিও একটি দিন খুবই নগন্য ভার্মন্ট ঘুরে দেখার জন্য। খুব সকালেই উঠেই চেক আউট করে গাড়ি হাকিয়ে চললাম ভার্মন্টের ঐতিহ্যবাহী শহর স্টোও এর উদ্দেশ্যে। না আমি না আমাদের ছোট্ট আনিকা ড্রাইভ করছে। আনিকা আর রুমানা সামনে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছে আর আমি পিছনে বসে ঝিমুচ্ছি। কোথাও ভ্রমনে গিয়ে পিছনে বসার অভিজ্ঞতা যে কিছুইনা সেটা এবারই বুঝলাম। ফ্রাঙ্কোনিয়া থেকে মাত্র দেড় ঘন্টার ড্রাইভ। নিউ হ্যাম্পশায়ারে আমরা ঠিক রঙ টা পাইনি। আমরা যত স্টোও এর দিকে এগুচ্ছি প্রকৃতি যেন ধুসর থেকে রঙিন হচ্ছে। প্রকৃতি তার শেষ বিদায়ের জন্য সাজগোজ করছে নতুন বউ রুপে। গাছের প্রতিটি পাতা ঝড়ে পরার আগে রঙিন রুপ ধারন করে। এ এক অদ্ভুত জীবন দর্শন। পাতা ফুলে রুপান্তিত হয়ে ঝড়ে পরে। জীবনের শেষ পরিনতিও যে রঙিন হতে পারে, হতে পারে কতোটা জৌলুসময় সেটা ভার্মন্টের ফল ফলিয়েজ না দেখলে বিশ্বাস করা কষ্টকর। মৃত্যুও যে কত বর্নিল হতে পারে তার প্রমান ভার্মন্ট। দুপুরের আগেই আমরা স্টোও তে পৌছে গেলাম।

বহুদিন ধরে লালন লালন করে আসা সাউন্ড অব মিউজিক মুভির বাস্তব রুপ কেমন সেটা দেখার স্বাধ আজ পুরন হলো। ভন ট্রাপ পরিবারের লজে পৌছে একটি দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লাম। মিলিয়ে নিলাম অনেক কিছু। বুঝতে বাকি রইল না কেন ভন এখানে এসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সারা দুনিয়া ঘুরে কেন এখানে এসেই ঘাঁটি গাড়লেন। ছবির মতো সুন্দর এই শহর।

আমাদের পরের গন্তব্য মাউন্ট ম্যান্সফিল্ড। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের সহায় ছিল না। ট্রাপ ফ্যামিলি লজ থেকে মাত্র ১০ মিনিটের পথ। দুদিন ধরেই বৃষ্টি হচ্ছে তাই এবছরের মত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ম্যান্সফিল্ড ট্রেইল। গুডিগুডি বৃষ্টির মাঝে দুর থেকে যতটুকু দেখা যায় দেখে আমরা রওনা দিলাম স্মাগলার্স নচের দিকে। স্মাগলার্স নচ এবং রুট ১০০ এর একটি ইতিহাস রয়েছে। ভারমন্টের দক্ষিণদিক থেকে উত্তরে যাওয়ার প্রধান রাস্তা রুট ১০০। ট্রাপ লজ থেকে সে-রাস্তা ধরার সহজ উপায় স্মাগলার্স নচ দিয়ে যাওয়া। লজের গেট থেকে বেরিয়ে ডানদিকে গেলে কয়েক মিনিট পরেই এক বনের মধ্য দিয়ে সেই আঁকাবাঁকা গিরিপথ। প্রথমে উঠে যেতে হয় পাহাড়ের ওপর। ওঠার পথ একসময় এমন সরু যে পাশে নোটিশ লাগানো – সামনে রাস্তায় কোনো বিভাজন চিহ্ন নেই। আসলে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে রাস্তাটি এতই সরু যে, দুদিক থেকে দুটি গাড়ি একসঙ্গে যাওয়া-আসা করতে পারে না। কয়েকটি জায়গায় রাস্তার বাঁক এমন আর তার দুপাশেই পাহাড়ি পাথর এমনভাবে খাড়া হয়ে উঠে গেছে যে, অন্যপাশ থেকে আসা কোনো যানবাহন একেবারেই দেখা যায় না। সেসব জায়গায় গাড়ির গতি একেবারে কমিয়ে আগে দেখা এবং তারপর যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আসলেই নাকি চোরাকারবারিরা একসময় সে-রাস্তা ব্যবহার করত আমেরিকা থেকে জিনিসপত্র কানাডায় পাচারের জন্য। অষ্টাদশ শতকের কোনো একসময় আমেরিকার সরকার বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর অনেক বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। সে-কারণে মার্কিন পণ্য অবৈধপথে কানাডায় এবং সেখান থেকে পরে ইউরোপে পাচার হতো। সে-রাস্তা দিয়ে নাকি পালিয়ে যাওয়া ক্রীতদাসরাও দেশ থেকে বেরিয়ে যেত।

তারপর আমাদের শেষ গন্তব্য বার্লিংটন। দুই ধারে সুউচ্চ পাহাড় তার মাঝ বরাবর আমরা ছুটে চলেছি। কখনও আবার পাহাড়ের উপর গাড়ি ছুটছে। কখনও মেঘ এসে গাড়ির উপর আছরে পরছে। দুর পাহাড়ে রোদ পরাতে রঙের ছড়াছড়ি। প্রকৃতি তার শেষ কৃত্তের জন্য সেজেগুজে প্রস্তুত। আর মাত্র দু-চারটে দিন। ধুসর হয়ে যাবে সব। শেষ হয়ে যাবে প্রকৃতির সকল জৌলুস। থেমে যাবে রঙের খেল। বিকাল নাগাদ আমরা পৌঁছলাম বার্লিংটন বে ধারে। সাথে চার্চ স্ট্রীট মার্কেট প্লেস তার ঠিক পাশে ভার্মন্ট ইউনিভার্সিটি। না এখানে কোন রঙের খেলা দেখলাম না দেখলাম নান্দনিক ভাবে সাজানো একটি পরিপাটি ছোট্ট শহর। দেখে মনে হলো সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ঐতিহ্যবাহী এই শহরের যত্ন ভালোই নিচ্ছেন। এক বুক প্রশান্তি এবং চোখ ভরা মুগ্ধতা নিয়ে সন্ধ্যা সময় গুরিগুরি বৃষ্টির মধ্যেই আমরা রওনা দিলাম নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে। শিক্ষা নিলাম জীবনের অন্য এক মানে। জীবনের এই বর্নিল পরিনতির কাছে শিক্ষা নিলাম জীবনের নতুন দর্শন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

Categories