বৃহস্পতিবার, ১১ অগাস্ট ২০২২, ০২:৪৮ অপরাহ্ন
বিশেষ ঘোষণাঃ
• করোনাভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, টিকা নিন। • গুজব নয়, সঠিক সংবাদ জানুন। • দেশের কিছু জেলা, উপজেলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং বিশ্বের কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে (খালি থাকা সাপেক্ষে) প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। • আপনি কি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ফিল্ম ও মিডিয়া, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা' বিষয়ে পড়ছেন? বাংলাদেশ প্রতিবেদন আপনাকে দিচ্ছে 'ইন্টার্নশিপ'-এর সুযোগ। • আপনিও হতে পারেন সাংবাদিক! চলতি পথে নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি, কারো সফলতা বা যেকোনো ভিন্নধর্মী খবর (ছবি অথবা ভিডিও) পাঠাতে পারেন। • হটলাইনঃ +৮৮০ ১৯ ০৯ ৮৬ ২৬ ১৬ (হোয়াটসঅ্যাপ), • ই-মেইলঃ protibedonbd@gmail.com • গুগল, ফেসবুক ও ইউটিউবে আমাদের পেতে Bangladesh Protibedon লিখে সার্চ দিন।

মাউন্ট ওয়াশিংটন: বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ আবহাওয়া যেখানে

লিটু আনাম, নিউইয়র্ক প্রতিনিধি
প্রকাশকালঃ রবিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২১

মাউন্ট ওয়াশিংটন: বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ আবহাওয়া যেখানে

মাউন্ট ওয়াশিংটন সম্পর্কে কম বেশী কিন্তু বাস্তবে যেন আরো বেশী কিছু দেখলাম। ৬২৮৮ ফুট (১৯১৭ মিটার) উচ্চতার এই পর্বত মিসিসিপি নদীর তীরে সবচেয়ে বিখ্যাত পর্বত। ৩০ মাইল দীর্ঘ প্রেসিডন্ট রেন্জ, হোয়াইট মাউন্টেইন এবং নিউ ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ পর্বত এটি এবং সমগ্র আমেরিকার ১৮তম সর্বোচ্চ পর্বত এই মাউন্ট ওয়াশিংটন। নিউ হ্যাম্পশায়ারের উত্তরে কোস কাউন্টিতে অবস্থিত এই মাউন্ট ওয়াশিংটনকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ আবহাওয়া স্হান। পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে রেকর্ড করা সর্বোচ্চ বায়ুর গতি এবং বেশী সময় ধারকের রেকর্ড ছিল এই পর্বতের। ১৯৩৪ সালের ১২ এপ্রিল মাউন্ট ওয়াশিংটনের চুড়ায় সর্বোচ্চ ২৩১ মাইল (৩৭২ কিমি) বায়ুর গতি রেকর্ড করা হয়েছিল যা ১৯৯৬ পর্যন্ত ছিল সর্বোচ্চ বায়ুর গতি। মাউন্ট ওয়াশিংটন সামিটের গড় তাপমাত্রা ২৬’ ফারেনহাইট। তাপমাত্রার পরিসীমা -৪৭’ ফারেনহাইট থেকে ৭২’ ফারেনহাইট। বাতাসের গড় গতি ঘন্টায় ৩৫.৩ মাইল। ৭৫ সেন্টিমিটারের বেশী বাতাস বছরে ১১০ দিন করে থাকে। সারা বছরই বরফ পরতে পারে যার গড় ২১.২ ফুট। এজন্যই মাউন্ট ওয়াশিংটনকে বলা হয় ‘the worst weather home’.

উদ্দেশ্য ফল ফলিয়েজ দেখা। নিউ ইয়র্কের আশেপাশে পাতার এই রং বদলের খেলা দেখা হলেও প্রকৃত রং বদল দেখা যায় ভার্মন্ট, নিউ হ্যাম্পশায়ার, মেইন এবং ম্যাসাচুসেট কিংবা পেনসিলভেনিয়ার কিছু জায়গা। তাই পূর্ব পরিকল্পনা মতো গত ১৬ অক্টোবর সাতজনের একটি গ্রুপ নিয়ে রওনা দেই নিউ হ্যাম্পশায়ারের উদ্দেশে। সকলেই আমার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাই। উদ্দেশ্য ছিল নিউ হ্যাম্পশায়ার, মাউন্ট ওয়াশিংটন, হোয়াইট মাউন্টেইন, বাড মাউন্টেইন এর আর্টিস্ট ব্লাফ ট্রেইল এবং ভারমন্টের স্টো, মাউন্ট ম্যান্সফিল্ড সাথে বার্লিংটন ঘুরে দেখা। সেটা হিসেবে এই সকল স্হানের কেন্দ্রবিন্দু ফ্রাংকোনিয়াতে একটি আলিশান বাড়িও দুদিনের জন্য ভাড়া পেয়ে গেলাম। ফ্রাংকোনিয়া পৌছে একটু গুগল ঘাটাঘাটি করে মাউন্ট ওয়াশিংটনের প্রতি আমাদের আগ্রহ বেডে গেল। ফল ফলিয়েজ পরের দিন দেখবো আগে মাউন্ট ওয়াশিংটন। আমরা মূলত কোথাও গেলে সেটা নিয়ে খুব একটা পড়াশুনা করি না তাতে ঠিক আবিশ্কার হয়ে উঠে না। মাউন্ট ওয়াশিংটনও তাই হলো। পছন্দের তালিকায় এক নম্বরে রেখে ঘুমিয়ে পরলাম আমরা কোন পড়াশুনা না করেই।

ফ্রাংকোনিয়া থেকে প্রায় ৫০ মাইল উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত এই মাউন্ট ওয়াশিংটন পর্বত। নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রকৃতির বর্ননা অন্য কোন লেখায় করবো। কারন দুটি সম্পূর্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা। প্রায় ৪০০ মাইল ড্রাইভ করে নিউ ইয়র্ক থেকে নিউ হ্যাম্পশায়ার আমরা সকলেই ক্লান্ত হয়ে পরি। প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চালানো সত্যি কষ্টকর। আর এই দু:সাধ্য সাধন করেছে আমাদের জুনিয়র আনিকা। আমার দেখা সেরা মেয়ে গাড়ি চালক হচ্ছে আনিকা। পরদিন ঘুম ভাঙতে সকলেরই দেরী হলো। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে বের হতে আরো সময় লাগলো। ভাবীসহ সাথে তিনজন নারী। সময় তো লাগবেই। আবার আমরা তিনটি গাড়ি হাকিয়ে চললাম মাউন্ট ওয়াশিংটনের দিকে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা ঠিক ২টার সময় মাউন্ট ওয়াশিংটনের টোল গেটে সিরিয়াল দিলাম। জিপিএসে লক্ষ্য করলাম এখনও ৯ মাইল পথ যেতে হবে, সময় লাগবে প্রায় ১ ঘন্টা। টোলের পরেই দেখলাম রাস্তা পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে। বুঝতে পারলাম বাকি পথ আমাদের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ড্রাইভ করতে হবে। টোল এমাউন্ট শুনে আগ্রহ আরো বেডে গেল। ৩ জন যাত্রীর গাড়ির টোল ৮৫ ডলার। আমরা যারা নিয়মিত ঘোরাঘুরি করি তারা আমেরিকার টোল সম্পর্কে ধারনা রাখি। কোথাও অতিরিক্ত টোল নেওয়া হয় না।

দিনটি মেঘলা ছিল, থেমে থেমে বৃষ্টিও হচ্ছিল। ক্ষনিক বাদেই রোদের উকিঝুকি। মেঘ বৃষ্টি রোদের এই লুকোচুরি যেন আমাদের সাথেই। মেঘলা কিংবা বৃষ্টিতে এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব না কিন্তু যখন রোদ এসে উকি দেয় তখন আমর গাড়িতে থাকা ড. রুমানা এবং আনিকার চেহারায় খুশির ঝলক বয়ে যায়। ড. রুমানা ফোন নিয়ে ছবি তোলা এবং ভিডিও করতে থাকে। আনিকা তো গাড়ির সান রুফ খুলে দাডিয়ে পরে ছবি তোলার জন্য। আবার যখন বৃষ্টি শুরু হয় তখন ওরা বলতে শুরু করে ভাই সাবধানে গাড়ি ড্রাইভ করেন। ফোনে কথা বলতে হবে না। খানিকটা ভয়, খানিকটা উত্তেজনা কাজ করতে সকলের ভিতর। কারন মুহুর্তের মধ্যে মেঘ এসে সব অন্ধকার করে দিচ্ছে। সামনের গাড়িও দেখা যাচ্ছে না ঠিক মতো। রাস্তায় কোন বেরিকেড কিংবা প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নাই। একটু এদিক ওদিক হলেই গাড়ি নিচে পরে যাবে আর আমরা পৌছে যাবো উপরে আমলনামা হাতে।

পাহাড়ি আঁকা বাঁকা রাস্তা ধরে আমি গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি খুব সাবধানে। আমার ঠিক সামনে জহিরের গাড়ি তার সামনে পাপ্পু ভাইয়ের গাড়ি । পুরোটা পথ আমরা ফোনে কনভারসেশন কলে ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম কার কার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। নাম বলবো না কিন্তু কেউ কেউ আবার দোয়া পড়া শুরু করেছিল। ভয় পাওয়ার কারন আছে। খুবই সরু আঁকা বাঁকা রাস্তা। একটু পর পরই কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। ওপাশ থেকে কোন এসইউভি কিংবা ভ্যান আসলে সাইড দিতে গেলে মনে হয় এই বুঝি কাত হয়ে পরে গেলাম। তারপর সব শেষ। রাস্তার পাশে কোন সুরক্ষা বাধও নাই। পাকা এবং সাহসী না হলে এই রাস্তায় গাড়ি না চালানোই ভালো। ড. রুমানা আমাকে বার বার কথা বলতে নিষেধ করছে। চুপচাপ গাড়ি চালাতে বলছে। বুঝতে পারলাম ওরাও ভয় পাচ্ছে।

আমরা যতোই উপরে উঠছি মেঘ ততোই আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। সামনে পিছনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু সামনের গাড়ির এমার্জেন্সি লাইট দেখে এগোতে লাগলাম। পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে, কখনো পাহাড়ের গা ঘেসে আবার কখনো ঢালের পাশে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। নিচের দিকে চোখ গেলে ভয়ে শরীর কাটা দিয়ে ওঠে। একসময় মেঘ আমাদের গ্রাস করে নিলো। আশপাশের ছোট ঘাঁসে মেঘ জমে কাশফুলের রুপ ধারন করেছে। ঝডো গতির বাতাসে যেন কাশবন নুয়ে পরেছে। বাতাসের ঝাপটা এসে কাশবন যেন মাটিতে নুয়ে পরছে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আমাদের চারপাশে মেঘে ঢাকা তাই ঠিকমত কিছু দেখতেও পারছি না। এই নয় মাইল পথ পাড়ি দিতে আমাদের ঠিক এক ঘন্টা সময় লেগে গেল। ঠিক তিনটার সময় আমরা মাউন্ট ওয়াশিংটনের চুড়ায় গাড়ি পার্ক করলাম।কিন্তু এরপর যা ঘটতে থাকলো তার জন্য আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।

গাড়ি থেকে নেমে ঠান্ডায় যেন জমে যাচ্ছিলাম। নিউ ইয়র্কে শীতে আমরা যে জ্যাকেট পরি সেটাই তো নিয়ে গেলাম কিন্তু এই ঠান্ডার কাছে এটা কিছুই না। আবার গাড়িতে উঠে হিট ছেড়ে শরীর গরম করে মনোবল চাঙা করে আবার নামলাম গাড়ি থেকে। দশ ফুট দুরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাকি পথ সিডি বেয়ে উঠে গেলাম চুড়ায়। এখানে দেখার কিছু নেই কারন ঝড়োগতির বাতাস, সাথে মেঘ, ঠান্ডায় জমে মেঘ বরফ হয়ে গেছে। আমরা মাউন্ট ওয়াশিংটন সামিটে দাডিয়ে ছবি তুললাম। তারপর দৌড়ে পাশের ক্যাফেতে ঢুকে পরলাম। ওয়াশরুমের গরম পানি যেন একটু স্বস্তি দিলো। ক্যাফে বন্ধ প্রায়। কারন চারটায় বন্ধ হয়ে যাবে। সর্বোশেষ কাস্টমার হিসেবে শুধু হট চকলেটই পেলাম। এই ঠান্ডার মাঝে হল চকলেট যেন অমৃত স্বাদ। প্রায় ৩০ মিনিটের মতো উপরে ছিলাম। আমাদের সাথে ছিলো সর্বো কনিষ্ঠ সদস্য আবিদ, পাপ্পু ভাইয়ের ছেলে। মাত্র দেড় বছর বয়স। তাই আর বেশীক্ষণ না থেকে যাত্রা শুরু করলাম ফেরার পথে। উপর থেকে তো নিচে কিছুই দেখা যায় না তাই কোন ধারনা ছিল না। চুড়ায় বিরুপ আবহাওয়ার পর প্রকৃতি যেন আমাদের উপর সদয় হলো। মেঘ থেকে বের হতে রোদের ঝলকানি। দুর পাহাড়ে রোদ, প্রকৃতি তার রুপ বদলে ফেললো মুহুর্তেই। যখনই একটু রোদ পেলাম গাড়ি পার্ক করে মেতে উঠলাম ছবি তোলার খেলায়। কারন চারিপাশে পাহাড়, পাহাড়ের চুড়ায় রোদের ঝলকানি, কোন এক পাহাড়ে পিপিলিকা সমতুল্য আমরা মুগ্ধ চোখে।যত নিচে নামছি ততোই মুগ্ধ হচ্ছি।
নামার সময় ছোট্ট একটি অঘটন ঘটলো। টোল অফিসার বলে দিয়েছিল যে নামার সময় মিনিমাম গিয়ারে গাড়ি চালাতে হবে এবং কিছুক্ষন পর পর বিরতি দিতে হবে। বিষয়টি আমি মেনে চললেও পাপ্পু ভাই আর জহির ভুলে দিয়েছিল মাউন্ট ওয়াশিংটনের ভয়াবহতা এবং জৌলুস দেখে। তাই হঠাৎ টায়ার পোড়া গন্ধ পেলাম খুব। হ্যা পাপ্পু ভাই আর জহির দুজনের গাড়িতেই ব্রেকে বার্ন হচ্ছে। আমার পাশের ঝর্না থেকে পানি এনে গাড়ি ঠান্ডা করলাম। তারপর আবার যাত্রা শুরু। এভাবে কিছুক্ষন পর পর বিরতি দিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে নেমে এলাম সমতলে। একই যাত্রায় প্রাকৃতিক ভয়াবহতা এবং সৌন্দর্য দুটোই উপভোগ একটি বড় পাওয়া। আমাদের ট্যুর শেষে ড. রুমানা তার ফেসবুকে পেজে ভ্রমন সম্পর্কে বলেন- “ A Journey to the freezing hell. It was a divine Experience”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ