শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন
জরুরী ঘোষণাঃ
দেশের কয়েকটি জেলা, উপজেলা, থানা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে (খালি থাকা সাপেক্ষে) প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। যোগাযোগঃ ০১৯ ০৯ ৮৬ ২৬ ১৬ হটলাইন। বিশ্বের কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। যোগাযোগঃ +৮৮ ০১৯ ০৯ ৮৬ ২৬ ১৬ হোয়াটসআপ। আপনিও হতে পারেন সাংবাদিক! চলতি পথে নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি, কারো সফলতা বা যে কোনো ব্যতিক্রম খবর পাঠিয়ে দিতে পারেন। ছবি ও ভিডিও থাকলে আরো ভাল। পাঠিয়ে দিন আমাদের এই ঠিকানায়: protibedonbd@gmail.com • আপনি কি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় পড়শুনা করছেন? বাংলাদেশ প্রতিবেদন আপনাকে দিচ্ছে ‘ইন্টার্নশিপ’ এর সুযোগ। আজই যোগাযোগ করুন। করোনা থেকে বাঁচতে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।

বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী

/ ৭২ /২০২১
প্রকাশকালঃ বুধবার, ১১ আগস্ট, ২০২১

বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী।

ড.আ.ন.ম এহছানুল মালিকী
গবেষক ও লেখক

হুমায়ুন আজাদ ২৮ এপ্রিল ১৯৪৭ সালে তার মাতামহের বাড়ি, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমানে বাংলাদেশ) অধীন বিক্রমপুরের কামারগাঁয় জন্ম নেন; যেটি বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার অন্তর্গত। তার জন্ম নাম ছিল হুমায়ুন কবীর। ১৯৮৮ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তনের মাধ্যম তিনি বর্তমান নাম ধারণ করেন। আজাদ ছিলেন বাবা আবদুর রাশেদ ও মা জোবেদা খাতুনের দ্বিতীয় পুত্রসন্তান।

১৯৫২ সালে আজাদ দক্ষিণ রাড়িখাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইনফ্যান্ট (প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা) শ্রেণীতে ভর্তি হন, সেখানে তিনি ইনফ্যান্ট থেকে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত মোট চার বছর অধ্যয়ন করেন। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ার জন্য তিনি স্যার জে সি বোস ইন্সটিটিউটে ভর্তি হন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী। এ বিদ্যালয় থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন (মাধ্যমিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য আজাদ ঢাকায় চলে আসেন। মানবিক বিভাগে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও বাবার ইচ্ছায় ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর একই বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬৮ সালে একই বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। হুমায়ুন আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াকালীন সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রাবাসে থাকতেন। ১৯৭৩ সালে তার প্রথম গবেষণা গ্রন্থ রবীন্দ্রপ্রবন্ধ: রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা এবং একইবছর সেপ্টেম্বরে কাব্যগ্রন্থ অলৌকিক ইস্টিমার প্রকাশিত হয়। সে বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ভাষাবিজ্ঞান পড়তে স্কটল্যান্ডে চলে যান। ১৯৭৬ সালে তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল বাংলা ভাষায় সর্বনামীয়করণ। এই গবেষণাপত্র ১৯৮৩ সালে প্রোনোমিনালাইজেশন ইন বেঙলি নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে প্রকাশিত হয়।
১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ২২ বছর বয়সে তার কর্মজীবন শুরু হয় চট্টগ্রাম কলেজে প্রভাষক হিসাবে। সেখানে কিছুকাল কর্মরত থাকার পর ১৯৭০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। একই বছর ১২ ডিসেম্বর তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালের ১ নভেম্বর আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীকালে বাংলা বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

হুমায়ুন আজাদের ৭টি কাব্যগ্রন্থ, ১২টি উপন্যাস ও ২২টি সমালোচনা গ্রন্থ, ৭টি ভাষাবিজ্ঞানবিষয়ক, ৮টি কিশোরসাহিত্য ও অন্যান্য প্রবন্ধসংকলন মিলিয়ে ৬০টিরও অধিক গ্রন্থ তার জীবদ্দশায় এবং মৃত্যু পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়। হুমায়ুন আজাদের কবিতার মাধ্যমে সাহিত্যচর্চার শুরু হয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হবার পর তবে বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে থাকাকালীন তার ‘ঘড়ি বলে টিক টিক’ শিরোনামে প্রথম দৈনিক ইত্তেফাকের শিশুপাতা কচিকাঁচার আসরে আসে। তার প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমূহ ‘জীবদ্দশায় হুমায়ুন আজাদের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৯৩) ও ‘কাব্যসংগ্রহ’ (১৯৯৮) এবং মৃত্যুর পরে ‘কাব্যসমগ্র’ (২০০৫)প্রকাশিত হয়।
তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৩-এর জানুয়ারিতে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘জ্বলো চিতাবাঘ’ প্রথম প্রকাশিত হয় মার্চ ১৯৮০ সালে, তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে’ যাবে ১৯৮৫ সালে, তার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘যতোই গভীরে যাই মধু, যতোই ওপরে যাই নীল’ ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয়। তার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’ প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ সালে। এর আট বছর পর ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয় তার ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু’ সপ্তম এবং শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘পেরোনোর কিছু নেই’ প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি, ২০০৪ সালে। জীবদ্দশায় তার সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তবে আজাদের মৃত্যুর পর ফেব্রুয়ারি, ২০০৫ সালে এই সাতটি কাব্যগ্রন্থ সহ আরো কিছু অগ্রন্থিত ও অনূদিত কবিতা নিয়ে কাব্যসমগ্র প্রকাশিত হয়।

হুমায়ুন আজাদ সর্বপ্রথম একটি ছোটগল্প লিখেছিলেন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে স্কটল্যান্ড থেকে এসে, গল্পটির নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘অনবরত তুষারপাত’। এই গল্পটি সহ ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত লেখা আরও পাঁচটি গল্প তিনি ‘যাদুকরের মৃত্যু’ (১৯৯৬) বইতে সংকলিত করেছিলেন। এরপর তিনি শিশুকিশোরদের জন্য আরো তিনটি গল্প লিখেন যেগুলো তিনি কিছু শিশুতোষ কবিতা সহ বুকপকেটে ‘জোনাকি পোকা’ (১৯৯৩) গ্রন্থে সংকলন করেন।

হুমায়ুন আজাদের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল’ (১৯৯৪), দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’ (১৯৯৫), তৃতীয় প্রকাশিত উপন্যাস ‘কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ’ (১৯৯৯) সালে ‘ফালি ফালি ক’রে কাটা চাঁদ (২০০১), ‘১০,০০০, এবং আরো ১টি ধর্ষণ’ ২০০২ সালে প্রকাশিত হয়। ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ ও একটি খুনের স্বপ্ন’ ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও ‘নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু’, ‘আব্বুকে মনে পড়ে’ (১৯৮৯) নামে উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিলো এবং ‘আমাদের শহরে একদল দেবদূত’ নামের আরো একটি কিশোর-উপন্যাসিকা ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।

‘লাল নীল দীপাবলি বা বাঙলা সাহিত্যের জীবনী’ (১৯৭৬), ‘নারী’ (১৯৯২), এবং একটি বিজ্ঞান-প্রবন্ধ ‘মহাবিশ্ব’ যা ২০০০ সালে প্রকাশিত হয়। ফরাসি নারীবাদী দার্শনিক ‘সিমোন দ্যা বোভোয়ারের’ ১৯৪৯ সালের গ্রন্থ ‘দ্বিতীয় লিঙ্গ হুমায়ুন আজাদ’ ২০০১ সালে বাংলায় অনুবাদ করেন। ফেব্রুয়ারি ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ গ্রন্থে তিনি তার স্বপ্নের বাংলাদেশের করুণ অবস্থা দেখে ব্যথিত হয়েছিলেন।

১৯৮৬ সালে তাকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮৬ সালে অগ্রণী ব্যাংক-শিশু সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৪ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার এবং ২০১২ সালে সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম এবং ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।

২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ আগস্ট রাতে একটি অনুষ্ঠান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আবাসস্থলে আকস্মিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন হুমায়ুন আজাদ। ১২ আগস্ট আবাসস্থলের নিজ কক্ষে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মরদেহ কফিনে করে জার্মানি থেকে ঢাকায় আনা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাযার নামাজ শেষে তার মরদেহ রাড়িখালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

Categories