বৃহস্পতিবার, ১১ অগাস্ট ২০২২, ০২:৩৭ অপরাহ্ন
বিশেষ ঘোষণাঃ
• করোনাভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, টিকা নিন। • গুজব নয়, সঠিক সংবাদ জানুন। • দেশের কিছু জেলা, উপজেলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং বিশ্বের কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরে (খালি থাকা সাপেক্ষে) প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হবে। • আপনি কি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ফিল্ম ও মিডিয়া, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা' বিষয়ে পড়ছেন? বাংলাদেশ প্রতিবেদন আপনাকে দিচ্ছে 'ইন্টার্নশিপ'-এর সুযোগ। • আপনিও হতে পারেন সাংবাদিক! চলতি পথে নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতি, কারো সফলতা বা যেকোনো ভিন্নধর্মী খবর (ছবি অথবা ভিডিও) পাঠাতে পারেন। • হটলাইনঃ +৮৮০ ১৯ ০৯ ৮৬ ২৬ ১৬ (হোয়াটসঅ্যাপ), • ই-মেইলঃ protibedonbd@gmail.com • গুগল, ফেসবুক ও ইউটিউবে আমাদের পেতে Bangladesh Protibedon লিখে সার্চ দিন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী

আ.ন.ম এহছানুল মালিকী
প্রকাশকালঃ শুক্রবার, ৩০ জুলাই, ২০২১

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে ঈশ্বরচন্দ্রের জন্ম ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮২০। মাতা ভগবতী দেবী ও পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুযোগ্য সন্তান ছিলেন বিদ্যাসাগর। গ্রামের পাঠশালায় তাঁর প্রথম শিক্ষা শুরু। এরপর পিতার সঙ্গে পায়ে হেঁটে আসেন কলকাতা এবং আসার পথে মাইলপোস্টের সংখ্যা গুণে গুণে গণিতের পাঠ গ্রহণ করেন। কলকাতার সংস্কৃত কলেজে তিনি ভর্তি হন।

প্রচণ্ড দারিদ্র্যের মধ্যে থেকে নিজের হাতে রান্নাবান্না করে রাস্তায় গ্যাসের লাইটে দাঁড়িয়ে ক্লাসের পড়া করে অতিকষ্টে তিনি বিদ্যাশিক্ষা করেন। অসামান্য মেধা ও কঠোর পরিশ্রম- এই দুইয়ের সমন্বয়ে তিনি প্রতি ক্লাসে প্রথম হতেন ও সেইজন্য বৃত্তি লাভ করতেন। দারিদ্র্যের কষাঘাত তাঁকে বিদ্যার সাধনা থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। ১৮৩৯ সালের ২২ এপ্রিল হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষায় ঈশ্বরচন্দ্র কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ১৬ মে ল কমিটির কাছ থেকে তাঁর যে প্রশংসাপত্রটি প্রাপ্তি হয় তাতেই প্রথম তার নামের সাথে বিদ্যাসাগর উপাধিটি ব্যবহার করা হয়েছিল। অসামান্য প্রতিভাবলে তিনি এই ভাবে বিভিন্ন শাস্ত্রে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। কেবল প্রাচ্য সংস্কৃত বিদ্যাই নয় পাশ্চাত্য ইংরেজি শিক্ষার প্রতিও তাঁর ছিল প্রগাঢ় অনুরাগ। কঠোর অধ্যাবসায় ও অমানুষিক পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে তাঁর জীবনের প্রস্তুতি পর্ব সমাপ্ত হয় ।

১৮৪১ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তিনি প্রধান পণ্ডিত হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি তিনি সংস্কৃত কলেজে নিযুক্ত হন। প্রথমে তিনি সহকারী সম্পাদকের পদ এবং পরবর্তীকালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ লাভ করেন। সেই সঙ্গে স্কুল পরিদর্শকের অতিরিক্ত কার্যভার গ্রহণ করেছিলেন। কিছুকাল পরে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতভেদ হওয়ায় তিনি কর্ম ত্যাগ করে বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। এই সময় তিনি কঠোর পরিশ্রম করে মেট্রোপলিটন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বাঙালিদের অশিক্ষার তমসা থেকে জ্যোতির্ময় আলোতে আনতে চেয়েছিলেন। জাতিকে তিনি মুক্তি ও বিচারবোধে উদ্দীপ্ত করতে চেয়েছিলেন। সেই জন্য প্রয়োজন ছিল উপযুক্ত শিক্ষার। সংস্কৃত কলেজের পুনর্গঠনের রিপোর্টে বিদ্যাসাগর তাঁর শিক্ষানীতিকে দৃঢ় করতে চেয়েছিলেন। কৃষিজীবী বয়স্ক মানুষের জন্য তিনি কার্মাটারে নাইট স্কুল খোলেন। মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনকে তিনি বৃহৎ বেসরকারি কলেজে পরিণত করেন ।

হার্ডিঞ্জের পরিকল্পনামতো তিনি ১০১ টি বঙ্গ বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের জন্য তিনি সব থেকে বেশি প্রয়াসী হয়েছিলেন। এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন, জড়তাগ্রস্ত সমাজের পক্ষে পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্ব কতখানি তিনি তা উপলব্ধি করেছিলেন। শিক্ষা বিস্তারে তার অদম্য উৎসাহের মূলে ছিল তাঁর সেই উপলব্ধি।

শিক্ষাবিস্তারই ছিল তাঁর সমাজসংস্কারের প্রাথমিক সোপান। কেবল পুরুষদের মধ্যেই নয়, নারী সমাজে ও শিক্ষাবিস্তারের জন্য ছিল তাঁর সমান উৎসাহ ।বহু বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন ছিল তাঁর অবিস্মরণীয় কীর্তি। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির স্বাক্ষর রেখে গেছেন তা সেকালের এক ব্রাহ্ম সন্তানের পক্ষে সত্যিই বিস্ময়কর।

মাতা ভগবতীর প্রতি শ্রদ্ধাই তাঁকে নারীমুক্তি আন্দোলনে নিয়োজিত করেছিল। রামমোহন সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নারীদের প্রতি যে শ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন, বিদ্যাসাগর সেই পথেই বিধবা বিবাহ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। শাস্ত্রীয় নিয়মের দোহাই দিয়ে সমাজপতিদের বোঝাতে চেয়েছিলেন বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত।

১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই, বিদ্যাসাগর ‘বিধবা বিবাহ আইন’পাস করিয়ে নেন। এখানেই তিনি থেমে থাকেননি, নিজের খরচে তিনি এক একটি করে বিধবা বিবাহ দিয়েছিলেন এবং সেই জন্য তাঁর ব্যক্তিগত ঋণ একসময় বিরাশি হাজার টাকায় পৌঁছে গিয়েছিল। এছাড়াও তিনি পুরুষের বহুবিবাহ রদ করতেও সচেষ্ট হয়েছিলেন। বাল্যবিবাহ নিবারণও ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান কীর্তি।

বাংলা সাহিত্য বিদ্যাসাগরের প্রতিভার কাছে গভীরভাবে ঋণী । বেতাল পঞ্চবিংশতি, বর্ণপরিচয়, সীতার বনবাস, শকুন্তলা, ভ্রান্তিবিলাস প্রভৃতি গ্রন্থ ছিল প্রবাহমান স্বতঃস্ফূর্ত গদ্যের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত । বিদ্যাসাগর রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিক্ষামূলক গ্রন্থ : ‘বর্ণপরিচয়’ (১ম ও ২য় ভাগ, ১৮৫৫), ‘ঋজুপাঠ’ (১ম, ২য় ও ৩য় ভাগ, ১৮৫১-৫২), ‘সংস্কৃতি ব্যাকরণের উপক্রমণিকা’ (১৮৫১), ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’ (১৮৫৩)।

অনুবাদ গ্রন্থ : হিন্দি থেকে বাংলা ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ (১৮৪৭), সংস্কৃত থেকে বাংলা ‘শকুন্তলা’ (১৮৫৪), ‘সীতার বনবাস’ (১৮৬০), ‘মহাভারতের উপক্রমণিকা’ (১৮৬০), ‘বামনাখ্যানম্’ (১৮৭৩)।

ইংরেজি থেকে বাংলা ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ (১৮৪৮), ‘জীবনচরিত’ (১৮৪৯), ‘নীতিবোধ’ (১৮৫১), ‘বোধোদয়’ (১৮৫১), ‘কথামালা’ (১৮৫৬), ‘চরিতাবলী’ (১৮৫৭), ‘ভ্রান্তিবিলাস’ (১৮৬১)।

ইংরেজি গ্রন্থ : ‘পোয়েটিক্যাল সিলেকশনস্’, ‘সিলেকশনস্ ফ্রম গোল্ডস্মিথ’, ‘সিলেকশনস্ ফ্রম ইংলিশ লিটারেচার’; মৌলিক গ্রন্থ : ‘সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব’ (১৮৫৩), ‘বিধবা বিবাহ চলিত হওয়া উচিত কিনা এতবিষয়ক প্রস্তাব’ (১৮৫৫), ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতবিষয়ক প্রস্তাব’ (১৮৭১), ‘অতি অল্প হইল’ (১৮৭৩), ‘আবার অতি অল্প হইল’ (১৮৭৩), ‘ব্রবিলাস’ (১৮৮৪), ‘রত্নপরীক্ষা’ (১৮৮৬) প্রভৃতি।

লঘু রচনার মধ্যে অতি অল্প হইল, আবার অতি অল্প হইল ইত্যাদি দৃষ্টি আকর্ষণীয়। মৌলিক রচনা হিসেবে প্রভাবতী সম্ভাষণ যা বিদ্যাসাগর রচনা করেছিলেন তাঁর বন্ধু রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একমাত্র কন্যার মৃত্যুতে ছিল একটি মনোগ্রাহী সাহিত্যিক নিদর্শন।

১৮৮০ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যাসাগর মহাশয়কে সিআইই উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৮৮৩ সালে বিদ্যাসাগর মহাশয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই এই অজেয় পৌরুষ শিখা চির নির্বাপিত হন। তাঁর নির্ভীক চরিত্রের মধ্যে প্রাচীন ভারতীয় ঋষির অতলান্ত প্রজ্ঞা, ইংরেজ সৈনিকের দুর্বার তেজস্বিতা এবং বাঙালি জননীর স্নেহ ও সুকোমল হৃদয়ের অপূর্ব সম্মিলন ঘটেছিল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ