মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন

নৈতিকতার একাল ও সেকাল

ফুয়াদ হাসান রঞ্জু / ১৩৭ /২০২০
প্রকাশকালঃ বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০

নৈতিকতার একাল ও সেকাল।

নৈতিকতা হল মানবিক আদর্শাবলীর একটি প্রণালী যা একটি সুখী জীবন লাভে আমাদের আচরণের নির্ধারক হয়। নৈতিকতা নিয়ে আমরা একটি সৎ জীবন-যাপন করি। আমাদের চারপাশের মানুষদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও আস্থা অর্জনে তা আমাদের চালিত করে। সুখের চাবিকাঠি হল নৈতিকতা।

আমাদের সমাজের নীতি-নৈতিকতা কেমন ছিল আর এখনকার সমাজের অবস্থানটা কোথায়? বিজ্ঞান আমাদের জীবনকে উন্নত করতে পেরেছে, চরিত্রকে নয়। মানুষকে যান্ত্রিক করেছে, মানবিক নয়। যুগের চাহিদায় মানুষ পেয়েছে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। পুরো বিশ্ব এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অপব্যবহার। নৈতিকতা হ্রাস পেয়েছে।
বর্তমান সময়ে মানুষ নৈতিকভাবে চরম বিপর্যস্ত। অনৈতিকতার আবদ্ধ বেড়াজাল হতে বের হতে পারছে না মানুষ।কিন্তু কোনো একসময় তো সমাজের মানুষ এরকম হীনমন্য ছিলো না।

একটা সময় ছিলো যখন মানুষের বাড়ি-ঘর ছিলো ছনপাতায় তৈরি।বাড়ির নিরাপত্তার জন্য ছিলো না কোনো বেড়া বা দেয়াল। ছিল না কোনো নিরাপত্তাকর্মী। কিন্তু সেই সময়ে মানুষকে হত্যা হতে হতো না।কেউ কারো বাড়িতে আঁড়ি পেতে থাকত না। মাত্র কয়েক বছর আগের কথা ছিলো এগুলো। কিন্তু বর্তমানে মানুষের বাড়ি-ঘর সহ দেয়াল অনেক মজবুত করে তৈরি করা। এরপর আছে নিরাপত্তাকর্মী। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়,এতো নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও মানুষকে রাতের অন্ধকারে নির্বিচারে খুন হতে হয়।তাহলে মানুষের নৈতিকতা কোথায় গেলো? তাহলে কি এর দায় সমাজের,রাষ্ট্রের নাকি সমাজ ব্যবস্থার?? কারো দায় নেই।এর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী ব্যক্তির মনোভাব।ব্যক্তির মনোভাব পরিবর্তন একান্ত জরুরি।

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বর্তমান বিশ্বে ব্যাপক ভাবে সাধিত হওয়ার ফলে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।আবার অনেকেই নীতি বিসর্জন দিয়ে নানা রকম অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে।আপনার স্কুল- কলেজ পড়ুয়া ছেলে মেয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে।কিন্তু আপনি কি কখনও খোঁজ নিয়ে দেখেছেন আপনার সন্তান সেই মোবাইল দিয়ে কি করছে? কখনও প্রয়োজন মনে করেননি।অথচ এই সকল ইলেট্রনিক ডিভাইসের অপব্যবহার করার ফলে তারা তাদের মেধার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে না।

স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিয়ে যতোই নৈতিকতার শ্লোগান দেন সেটা হবে না। আগে তাদেরকে নৈতিক শিক্ষা দিন তারপরে মোবাইল ফোন হাতে তুলে দেন। যদি নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি থাকে তাহলে তারা নানা রকম অপকর্মে লিপ্ত হয়ে যাবে এটাই বাস্তবতা।আর যদি নৈতিক শিক্ষা তার মধ্যে থাকে তাহলে সে জাতিকে চমৎকার কিছু উপহার দিতে পারবে।

সেকালে এতো প্রযুক্তি ছিলো না।কিন্তু সহমর্মিতার কোনো ঘাটতিও ছিলো না।আজকে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই কিন্তু মানুষের নৈতিকতার অভাব চরমে পৌঁছে গেছে। এর দায় কার? পরকীয়া মহামারি আকার ধারন করেছে। কিন্তু এর জন্য বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি দায়ী নয়।দায়ী মানুষের চরিত্রহীনতা বা হীনমন্যতা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে ফেসবুক। এটি দেশের যুব সমাজের মধ্যে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন বয়সের লোক এই ভাইরাসে আক্রান্ত। কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে।

বাংলাদেশে খাবারে ভেজাল আজ কোনো গোপনীয় ব্যাপার নয়। মনে হচ্ছে সবার মধ্যে এটা এক ধরণের অলিখিত বৈধতা পেয়েছে। এখন মহাসমারোহে প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্য মরণব্যাধির নানা বিষাক্ত পদার্থে পরিপূর্ণ। কিন্তু এমন তো কথা ছিল না।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না একটি দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তাদের নৈতিকতা। আমরা তাজা রক্ত বিসর্জন দিয়েছি একটি বৃহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, তৈরি করেছি মহান আত্মত্যাগের অবিস্মরণীয় ইতিহাস। ১৯৭১ সালের সেই রক্তাক্ত আত্মবিসর্জন আমাদের দিয়েছে ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র।

এই মহান আত্মত্যাগ, এই ভৌগোলিক স্বাধীনতা যথার্থ পূর্ণতা পাবে যদি আমরা আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অর্জনের মাধ্যমে সুস্থ সবল জাতি গঠন করতে সক্ষম হই। কারণ একটি সুস্থ সবল জাতিই পারে সব শৃঙ্খল, প্রতিকূলতা ছিন্নভিন্ন করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে।

আজকের এই পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে যখন সেকালের পরিস্থিতি মেলাতে যাই তখন সত্যিই অবাক না হয়ে পারি না। আমাদের এক জীবনে শিক্ষার পরিবেশের এত অবনমন হবে, তা কখনো ভাবতেও পারিনি।

আজ ছাত্র শিক্ষককে সম্মান করে না, শিক্ষক ছাত্রকে স্নেহ করেন না। শিক্ষা যেন অন্য যেকোনো পণ্যের মতো হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা এভাবে চলতে পারে না। সময় বদলায়, তার সঙ্গে মানুষও। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপার কখনো বদলাতে পারে না। এটা আমাদের মাথায় রাখা উচিত।

বিজ্ঞানের এই অগ্রগতির ফলে মানুষের পোষাক পরিচ্ছদের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।পোষাকেও নৈতিক স্থলন ঘটেছে মানুষের।

আমাদের সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনেও অনৈতিকতা ও আদর্শহীনতার ছোঁয়া লেগেছে। অন্যের সফলতা আমাদের সহ্য হয় না। তাই তো সুযোগ পেলেই কাউকে বিপদে ফেলতে এতটুকু দ্বিধা করি না। কারও বিপদে সাহায্য করি না। দাঁড়িয়ে তামাশা দেখি। সেলফি তুলি, ভিডিও করি। যাঁরা সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন, তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ আবার এটাকে ব্যবসা বা ভিন্ন চোখে দেখেন। ফেসবুক/ইউটিউবে লাইভ করেন, অনুসারী বাড়ানোর জন্য।

অন্যের নামে কুৎসা রটানো, অপদস্থ করা, রাস্তাঘাট ও গণপরিবহনে নারীদের কটূক্তি করা, তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মারামারি, খুন—কোনোটিই বাদ পড়ছে না। ব্যাপারটা এমন হয়ে গেছে যে আমিই ভালো, আমিই সব সবকিছু পাবো, সবকিছু আমারই হতে হবে, আমার থেকে অন্য কেউ ভালো থাকতে পারবে না, সেটা যেভাবেই হোক,আমার চেয়ে কেউ ভালো না ইত্যাদি।

সমাজের প্রত্যেকটি জায়গায় দুর্গন্ধের মতো ছড়িয়ে পড়েছে নানা রকম অনৈতিক কার্যকলাপ।
আমরা সবাই যদি আমাদের নিজের কাজটি সঠিকভাবে করি, তাহলেই নৈতিকতার অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব হবে। সমাজের অন্যায়-দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। নিজে না করে অন্যকে প্রতিনিয়ত দোষারোপ করে কোনো সমাধান হবে না। এমন নয় যে আমরা বিবেকহীন, নীতিহীন, আদর্শবিহীন এক লোভী মানুষে পরিণত হয়েছি; যা থেকে আমরা নিজেরাই সরে আসতে চাই না?

লেখকঃ সাংবাদিক

Exchange Rate


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস

সর্বমোট

আক্রান্ত
৫৪৬,২১৬
সুস্থ
৪৯৬,৯২৪
মৃত্যু
৮,৪০৮
সূত্র: আইইডিসিআর

সর্বশেষ

আক্রান্ত
সুস্থ
মৃত্যু
স্পন্সর: একতা হোস্ট

Categories

নামাজের সময়সূচী

  • ফজর
  • যোহর
  • আছর
  • মাগরিব
  • এশা
  • সূর্যোদয়
  • ৫:০৯
  • ১২:১৪
  • ১৬:২২
  • ১৮:০৫
  • ১৯:১৮
  • ৬:২০